ফিলিপাইনে এফবিআই জাল ফেলেছে

5950_bfরাজকোষ কেলেঙ্কারির খলনায়ক কারা? কীভাবে লোপাট করা হয়েছে বাংলাদেশের ৮০০ কোটি টাকা। কোথায় আছে এখন এই অর্থ। কীভাবে উদ্ধার করা যায় তা। এজন্য ফিলিপাইনে জাল পেতেছে বিখ্যাত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। কাজ শুরু করেছেন এফবিআইয়ের ঝানু গোয়েন্দারা।
হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট শ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় তোলপাড় চলছে সারা দুনিয়ায়। ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হ্যাকিং কেলেঙ্কারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে একে। এ ঘটনার তদন্ত পর্যবেক্ষণের কথা এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একযোগে তদন্ত চলছে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে। সতর্ক বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থা। সত্য বের করে আনতে কাজ করছেন অনেকে।
ফিলিপাইনের সিনেট কমিটিতে এরই মধ্যে শুনানি হয়েছে এই অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে। কাজ করছে একাধিক সংস্থা। এ কেলেঙ্কারির তদন্তে ফিলিপাইনে এফবিআইয়ের কাজ শুরু করার কথা জানা গেছে গতকাল। সংস্থাটির সদস্যরা এরই মধ্যে কথা বলেছেন, তদন্ত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে। ওদিকে, ফিলিপাইনের তদন্ত কার্যক্রমের দিকে নজর রাখছেন সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা। সিনেট
কমিটির শুনানিতে নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন তারা। খোয়া যাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ জুয়ার বাজারে চলে যাওয়ায় তা উদ্ধারে আইন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও একাধিক সূত্র দাবি করছে এ অর্থ ফেরত আনা এখন খুবই কঠিন হবে।  ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গোমেজ বলেছেন, প্রমাণিত হয়েছে যে, এখানে টাকাটা এসেছে এবং এখানে কিছু কিছু একাউন্টে টাকাটা জমা হয়েছিল। তারপর এদের ম্যানেজমেন্ট তারাও একটা নিজস্ব তদন্ত করছে। এখানকার সেন্ট্রাল ব্যাংক তদন্ত করছে। এখানে যেটা বোঝা যাচ্ছে যে, বেশিরভাগ টাকাই ক্যাসিনোতে পৌঁছে গেছে। তাদের আইন কী বলে এ ব্যাপারে সেটা তারা আমাদেরকে জানাবে পরে। এফবিআই থেকেও লোক এখানে চলে এসেছে। তারাও তাদের তদন্ত করছে এখানে। আজ  সিনেট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ শুনানি রয়েছে।
সিআইডির তদন্ত শুরু: ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ইউএস ডলার চুরির আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। তদন্তে সহায়তার জন্য সিআইডি, ডিবি ও পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে চৌকস একটি সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ১০টার দিকে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক শাহ আলমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি দল বাংলাদেশ ব্যাংকে যান। এই দলে অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহেল বাকি ও তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলামও ছিলেন। এসময় তারা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রথম বৈঠক করে একাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দ্যা ডিলিং রুমে যান। সেখানকার সুইফট সার্ভার বিকল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। সিআইডির দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি স্পর্শকাতর। এটি খোদ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তদারক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো ধরনের বক্তব্য দেয়াতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, সিআইডির কয়েকজন চৌকস কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরির এই রহস্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করবে।
সিআইডি সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের সকল কর্মকর্তাকে সন্দেহের তালিকায় রেখে তদন্ত শুরু করেছে সিআইডি। গতকাল তারা ওই ডিপার্টমেন্টের সবগুলো কক্ষ ও কার্যক্রম খতিয়ে দেখেন। একই সঙ্গে ওই ডিপার্টমেন্টের কর্মরত সকল কর্মীর তালিকা সংগ্রহ করেন। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে গতকাল সিআইডি কিছু আলামতের তালিকা করেছে। তবে গতকাল কোনো আলামত তারা সংগ্রহ করেনি। ঘটনাটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সিআইডির কর্মকর্তারা সূক্ষ্মভাবে কাজ করছেন। যাতে কোনোভাবেই বিনা দোষে কাউকে হয়রানি বা নাজেহাল হতে না হয়। সিআইডি সূত্র জানায়, গত ৪ ও ৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়াটাকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কেন ওই দুদিন সিসিটিভি ফুটেজ ধারণ হয়নি তা জানার চেষ্টা  চলছে। এমনকি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে কারা কখন অফিস থেকে বেরিয়েছেন এবং ৫ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার কারা কারা অফিস করেছেন এবং ঠিক কী কী করেছেন তা জানার চেষ্টা চলছে। সূত্র জানায়, এই দুদিনেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে থাকা হ্যাকার চক্রের সহযোগী কেউ সুইফট সার্ভারে সুকৌশলে ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেয়। এরপর হ্যাকাররা বাইরে বসে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে পেমেন্ট অর্ডারের পর যে কোয়ারি আসে তার ইনভয়েস তৈরি করে। পেমেন্ট অর্ডারের পর ৫ই ফেব্রুয়ারি ১০টা ২৪ মিনিটে প্রথম ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে কোয়ারি আসে। হ্যাকাররা একটির পর একটি কোয়ারি ইনভয়েস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে নিজেরাই পাঠিয়ে দেয়। সূত্র জানায়, সুইফট কোডের সার্ভারটি সবসময় অটোমেটিক কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পেমেন্ট অর্ডার পাঠানোর পর কোয়ারি আসার পর অটোমেটিক ইনভয়েস তৈরি হয়। তা একদিকে যেমন সার্ভারের ব্যাকআপ ফাইলে জমা হয়ে থাকে তেমনি অটোমেটিক তা প্রিন্টারে গিয়ে প্রিন্ট হয়ে যায়। সেসব প্রিন্ট থেকে কর্মকর্তারা সর্টিং করে থাকেন। সূত্র জানায়, সুইফট সার্ভার ও প্রিন্টার বিকল করতে হ্যাকারদের একাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দি ডিলিং রুমের কেউ সহায়তা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এই অফিসের নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে নিজেদের কেউ ম্যালওয়্যার প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। সিআইডি সূত্র জানায়, গতকাল তারা বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে অবস্থান করেন। এসময় তারা একাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দি ডিলিং রুমে কর্মরত কর্মকর্তাদের কার কি দায়িত্ব তা নোট করেন। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকও করেন। সিআইডি সূত্র জানায়, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাক অফিস অব দি ডিলিং রুমের প্রত্যেক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাদা আলাদা কথা বলবেন। এজন্য কার ওপর কি দায়িত্ব ছিল তা জেনে নিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলাম বলেন, আমরা তদন্ত কাজ শুরু করেছি। খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সংস্থা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দ্যা ডিলিং রুমের ১২ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা প্রত্যেকের কাছে ঘটনার বিশদ বিবরণ শুনে কার গাফিলতি এবং কার সম্পৃক্ততা রয়েছে তা জানার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা ফায়ার আই যে কম্পিউটারগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করছে তার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। ফায়ার আইয়ের ওই প্রতিবেদন হাতে পেলে কারো ব্যবহৃত কম্পিউটার থেকে ম্যালওয়্যার ঢুকেছে কিনা এবং কোনো কম্পিউটার থেকে ব্যাকআপ ফাইল ডিলিট করা হয়েছে কিনা অথবা ইউএসবি পোর্ট ব্যবহার করে কোনো কিছু কম্পিউটারে ঢোকানো এবং বের করে নেয়ার বিষয়গুলো জানা যাবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তদন্ত সূত্র জানায়, তারা মামলার বাদী একাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা, সহকারী পরিচালক রফিক আহমেদ মজুমদারকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন।
ঘটনা তদন্তে পুলিশের একাধিক কমিটি: বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির আলোচিত এই ঘটনা তদন্তে সিআইডির পক্ষ থেকে অন্তত তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত তদারক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সূত্র জানায়, সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের এডিশনাল ডিআইজি শাহ আলমের নেতৃত্বে বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ হেল বাকি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলামসহ ৫ কর্মকর্তা সরাসরি ঘটনার তদন্ত করবেন। এছাড়া, সিআইডি, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি ও পুলিশ সদর দপ্তরের চৌকস কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদন্ত সহায়তার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করবেন। এছাড়া, সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি তদন্ত তদারক কমিটি ও পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত তদারক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রিজার্ভ চুরির মামলায় প্রতিবেদনের দিন ধার্য: ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ইউএস ডলার চুরির মামলার প্রতিবেদন জমা দেয়ার দিন ধার্য করে দিয়েছে আদালত। আগামী ১৯শে এপ্রিল সিআইডিকে আদালতে এই মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালতের হাকিম মাহবুবুর রহমান এই দিন ধার্য করেন বলে জানিয়েছেন আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই জালাল আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্রেও ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশের অর্থ ‘হ্যাকিংয়ের’ মাধ্যমে  চুরির ঘটনায় মানি লন্ডারিং ও তথ্য প্রযুক্তি আইনে মঙ্গলবার মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা।

Shortlink:

Q&A

You must be logged in to post a comment Login