বাংলাদেশে প্রথমবারের মত স্যাটেলাইট ফোন আটক, স্যাটেলাইট ফোনের এটুজেড

সোমবার রাতে চট্টগ্রামের বন্দরটিলা থেকে একটি স্যাটেলাইট ফোনসহ ইয়াবা পাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া স্যাটেলাইট ফোনটি যুক্তরাষ্ট্রের বহুল ব্যবহৃত ইরিডিয়াম ব্র্যান্ডের। দেশি মাদক পাচার চক্রের কাছ থেকে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ফোন জব্দ করা হয়েছে চট্টগ্রামে। স্যাটেলাইট ফোন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণের মত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সরাকারের বিটিআরসি কিংবা অন্যকোন সংস্থার নেই বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানোর জন্য বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তের মাদক পাচার চক্রর সদস্যরা এই ফোন ব্যবহার করছিলো।

যাদের আটক করা হয়েছে
সোমবার রাতে যে তিন জনকে আটক করা হয়েছে তাদের নাম সৈয়দ আলম, মো. শাহজাহান ও মঞ্জুরুল হোসেন। এর মধ্যে সৈয়দ আলমের বাড়ী টেকনাফে আর শাহজাহন এবং মনজুরুল হকের বাড়ী বন্দরটিলা এলাকায়। তাঁদের কাছ থেকে ৯ হাজার ইয়াবা বড়ি, পাঁচ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬ টাকা, ১২টি মুঠোফোন সেট, একটি স্যাটেলাইট ফোন, একটি ভিডিও ক্যামেরা ও একটি চীনে তৈরি চাকু উদ্ধার করা হয়েছে।

র‍্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি ভাড়া করে মাদকের ব্যবসা করে আসছিল। তারা নগরের বিভিন্ন স্থানে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা করত। তাদের কাছে একটি স্যাটেলাইট ফোনও পাওয়া গেছে। তিনি জানান, এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, এটাই প্রথম দেশী অপরাধী চক্রের হাতে স্যাটেলাইট ফোন আটকের ঘটনা। এর আগে ভারতের আসামের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড লিবাশেন ফ্রন্ট অব আসাম ‘উলফা’র শীর্ষ কমান্ডার অনুপ চেটিয়ার কাছ থেকে এই ধরনের স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়েছিলো। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় জঙ্গি এবং মাদকপাচারকারী চক্র স্যাটলাইট ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ কর্মকান্ড পরিচালিত করে। এই ধরনের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ট্র্যাক কিংবা মনিটরিং এর কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশের নেই বলেও র‌্যাব সূত্র নিশ্চিত করেছে।

স্যাটেলাইট ফোন কি?
মোবাইল এ নেটওয়ার্ক এর কানেকশন (ফিকুয়েন্সি) পায় কোম্পানির নিজস্ব টাওয়ার থেকে আর টাওয়ার কানেকশন পায় স্যাটেলাইট থেকে। মূলতঃ সব কিছুর মূলে স্যাটেলাইট। যে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে সে দেশের নেটওয়ার্ক খুব ভাল বলা যায়। স্যাটেলাইট মোবাইলে যে কোন জায়গা থেকে ফোন করা যায়। তার জন্য টাওয়ারের দরকার হয় না। Thuraiya satellite mobile ইরাক আর আফগানিস্তান যুদ্ধে বেশ উপকারে এসেছিল। তখন সেট বড় ছিল কিন্তু এখন সাধরণ মোবাইলের মতোই। যে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ধার করা। তাই এ দেশের খরচ ও নেট ধীর গতি বেশি।

মোবাইল ফোন এবং স্যাটেলাইট ফোনের মধ্যে পার্থক্য
স্যাটেলাইট ফোন আর মোবাইল ফোনের তেমন কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু নেটওয়ার্কিং সিস্টেমে। এখানে টেলিস্ট্রিরিয়াল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয় না। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। এজন্যই যেকোন স্থানে বা আবহাওয়ায় এই ফোনের নেটওয়ার্ক কখনও বিকল হয় না। বিশেষ করে সামুদ্রিক জলযান বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত স্যাটফোনের ব্যবহার অত্যধিক। এছাড়াও দুর্গম এলাকায় এই ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব।

স্যাটেলাইট ফোনের ইতিবৃত্ত
আশি বা নব্বইয়ের দশকের দিকে যখন মোবাইল ফোন প্রযুক্তি চালু হয় তখন থেকে স্যাটফোনও আবিষ্কৃত হয়। যোগাযোগমাধ্যমকে আরও সহজতর করতে আগেকার দিনের বিশাল আকৃতির এসব টেলিফোন এখন একটা ছোট স্মার্টফোনের চেয়ে বড় নয়। কিছু বিশেষ ধরনের যানবাহন কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটফোনের ব্যবহার এখন অনেক বেড়েছে। যুদ্ধ জাহাজে প্রায়ই একটি ঘুরন্ত মাইক্রোওয়েভ এন্টেনা দেখা যায়, যার কাজই হলো স্যাটেলাইটের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। তার কারণ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া থেকে দিক নির্দেশ করা আধুনিক যুদ্ধ জাহাজের সব ধরনের অবস্থান নির্ণয়ের কাজই করা হয় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে।

স্যাটেলাইট ফোনের সমস্যা
স্যাটেলাইট যোগাযোগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উন্মুক্ত প্রান্তর ছাড়া স্যাটেলাইট রিসেপশনের হার খুবই দুর্বল। সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের টেলিস্ট্রিয়াল রিসেপশন কঠিন পদার্থ ভেদ করতে পারলেও স্যাটেলাইট ফোন ঘরের মধ্যে কিংবা অফিসে যোগাযোগ তৈরি করতে পারে না বলে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কিং-এ এটি জনপ্রিয় হতে পারেনি।

যেভাবে কাজ করে স্যাটেলাইট ফোন
কয়েকটি পদ্ধতিতে কাজ করে স্যাটেলাইট ফোন। কিছু ক্ষেত্রে এটি যে পদ্ধতি ব্যবহার করে তাকে বলে জিওসিংক্রোনাস অরবিট। এর মানে হলো তিন থেকে চারটি কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থির অবস্থায় থাকে এবং এগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেই গোটা বিশ্বে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। তবে এসব স্যাটেলাইট খুবই ভারী, প্রায় ৫ হাজার কিলোগ্রাম এবং তৈরি ও উৎক্ষেপণ খুবই ব্যয়বহুল। এসব স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে প্রায় ২২ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। এজন্য এসব স্যাটেলাইটে টেলিফান যোগাযোগ অনেক ধীরগতিসম্পন্ন। এজন্য পৃথিবী থেকে কম দূরত্বে যেসব স্যাটেলাইট অবিরত ঘূর্ণ্যমান সেসব লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটে ফোনের যোগাযোগ সহজ হয়। মাত্র ৪০০ থেকে ৭০০ মাইল দূরের কক্ষপথে প্রচন্ড বেগে ঘূর্ণনরত এসব স্যাটেলাইট মাত্র ৭০ থেকে ১০০ মিনিটে পৃথিবীকে পদক্ষিন করে। এসব স্যাটেলাইট ২৮০০ কিলোমিটার ব্যাসের মধ্যে নেটওয়ার্ক কভারেজ দিতে পারে। এই নেটওয়ার্কে মোবাইলে তথ্য আদান-প্রদানের গতি প্রতি সেকেন্ডে ২২০০ বিট থেকে ৯৬০০ বিট।

এখনও ব্যয়বহুল স্যাটফোন
স্যাটফোন এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট ব্যয়বহুল। অন্যান্য মোবাইল ফোনের তুলনায় এর ব্যয় অনেক বেশি। স্যাট টু স্যাট ফোনে প্রতি মিনিটে ০.১৫ থেকে ২ মার্কিন ডলার ব্যয় হলেও স্যাটফোন থেকে সাধারণ মোবাইল ফোনে কথা বলতে খরচ হয় ৩ থেকে ১৪ ডলার। অনেক কোম্পানীতে এই হার প্রায় ১৫ ডলার। তবে চলতি বছরে গেস্নাবারস্টার স্যাটফোনে নির্দিষ্ট খরচে মেয়াদহীন কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। সব স্যাটফোনই প্রি-পেইড, কার্ডের দাম ১০ থেকে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত।।

স্যাটেলাইট ফোন যারা ব্যবহার করেন
উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েব সাইট সূত্রে জানা গেছে, ইরিডিয়াম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল স্যাটেলাইট ফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। ৬৬টি লো- আর্থ অরবিটিং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তারা পৃথিবীব্যাপী এই সেবা দিয়ে থাকে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যূরো, বিদেশী দূতাবাস ও বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করতে পারে।

বিশ্বের অনেক দেশে এখনও স্যাটেলাইট ফোন নিষিদ্ধ
বিশ্বে মাত্র সাত থেকে আটটি কোম্পানী স্যাটেলাইট ফোন পরিসেবা দেয়। এসব কোম্পানীর মধ্যে গেস্নাবালস্টার ৪৪টি স্যাটেলাইট এবং ইরিডিয়াম ৬৬ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে স্যাটফোন সেবা দেয়। তবে বিশ্বের অনেক দেশেই স্যাটেলাইট ফোন নিষিদ্ধ করা আছে। উত্তর কোরিয়া, ভারত, কিউবা, মায়ানমার, লিবিয়া, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে স্যাটফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্যাটেলাইট ফোনে ট্র্যাকিং পদ্ধতিতে মোবাইল ব্যবহারকারী কোন স্থানে কি অবস্থায় আছে সেটিও জানা সম্ভব। তবে স্যাটফোন মোবাইল ফোনের তুলনায় বহুগুণ বেশি ব্যয়বহুল। স্যাট টু স্যাটফোনে প্রতি মিনিটে দশমিক ১৫ থেকে দুই মার্কিন ডলার ব্যয় হলেও স্যাটফোন থেকে সাধারণ মোবাইল ফোনে কথা বলতে খরচ পড়ে তিন থেকে ১৪ মার্কিন ডলার। অনেক কম্পানিতে এই হার প্রায় ১৫ ডলার।

সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্যাট ফোন
আশি বা নব্বইয়ের দশকের দিকে যখন মোবাইল ফোন প্রযুক্তি চালু হয় তখন এই স্যাটেলাইট ফোনগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ছিলো না। তবে এবার স্যাট-ফোন সাধারণের ব্যবহারের জন্য বাজারে আনার ঘোষণা দিলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পট। মাত্র ৩৮ হাজার টাকায় এই ফোন এখন পৌঁছে যাবে মানুষের কাছে। ব্যাক্তিগত ভাবে একজন পাইলটও এই ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। বিমানে বসেই হেড ফোনে যোগাযোগ করতে পারবেন দাপ্তরিক কিংবা ব্যক্তিগত কাজে। স্পট গ্লোবাল ফোন নামের এই সেটটি দেখতে অনেকটা নব্বইয়ের দশকের নকিয়ার মতো। ছোট স্কীনের এই ফোন সাদাকালো। কিন্তু এই সেটের মাধ্যমে আপনি যেখান থেকে খুশি কথা বলতে পারবেন, সে হতে পারে যে কোন উচু পাহাড় বা যে কোন দূরবর্তী মহাসমুদ্র।

ফাঁকি দেওয়ার জন্যই স্যাটেলাইট ফোনের ব্যাবহার
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘প্রচলিত মোবাইল এবং অনান্য নেটওয়ার্ক মনিটরিং হওয়ার কারনে পাচারকারীদের গতিবিধি নজরে চলে আসতো, তাই তারা ফাঁকি দেওয়ার জন্য স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করতো বলে মনে হচ্ছে।’ ‘সম্প্রতি আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারনে মাদক পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। তারা অপেক্ষাকৃত দূর্গম পাহাড়ী এলাকা এবং গভীর সমুদ্রের দিকে রুট সরিয়ে নিয়েছে যেখানে সাধারণত মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই,’ জানান তিনি। নজরুল ইসলাম আরো জানান, ‘স্যাটেলাইট ফোনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য একবারেই নতুন। আমাদের সিস্টেমে স্যাটেলাইট ফোনের যোগাযোগ ট্র্যাকিং নাও হতে পারে। কিভাবে তারা এটা ব্যবহার করছে তা আমরা অনুসন্ধান করে দেখবো। তবে কলম্বিয়া, থাইল্যান্ডসহ বড় বড় মাদক পাচারকারী চক্র এই ধরনের যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করা স্বাভাবিক ঘটনা।’

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যা বললেন
র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা চক্রের সন্ধান পেয়ে বন্দরটিলার অভিযান চালানো হয়। চক্রটি যে স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করতো সেই ব্যাপারে র‌্যাবের কাছে অভিযানের পূর্বে কোন তথ্য ছিলো না। র‌্যাব-৭ এর এসএসপি দেলওয়ার হোসেন জানান, ‘মাদক পাচার চক্রের কাছ থেকে ইরিডিয়াম ব্রান্ডের স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়েছে, যা দিয়ে বিশ্বের যেকোন স্থান থেকে যেকোন প্রযুক্তির ফোনে কথা বলা যায়। সাধারণ প্রযুক্তির মোবাইল ফোনের নেটওযার্ক নেই এমনস্থানেও এই ফোন কার্যক্ষম।’

এএসপি দেলওয়ার জানিয়েছেন, ‘সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক যেভাবে ফলো করা হয় স্যাটেলাইট ফোন ট্র্যাকিং করার সেই ধরণের কোন ব্যবস্থা আমাদের কাছে নেই, এমনকি বিটিআরসিও এই ব্যাপারে কিছু করতে পারে না, এটা বিটিআরসির আওতার বাইরে,’

তিনি আরো জানান, ‘আটককৃত তিন জনের নামে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা হবে, তবে, স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধারের ঘটনায় কোন ধারায় অভিযোগ আনা হবে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

Shortlink:

Q&A

You must be logged in to post a comment Login