‘হ্যালো বাবা আমি টরেন্টো থেকে বলছি, ভালো চাকরিও পেয়েছি!’

RAB-22‘হ্যালো বাবা, আমি টরেন্টো থেকে বলছি! ভালো একটি কোম্পানিতে চাকরিও পেয়েছি। চুক্তি অনুযায়ী মজিবুরের মাধ্যমে টাকাটা দিয়ে দিও। আচ্ছা, টাকা দিয়ে দিব। তুমি কোনও চিন্তা করো না।’ নম্বরটাও দেশের বাইরের। +১৬৪৭৫৫৭৯৫৮…। স্বস্তি স্বজনদের মধ্যে। যাক, এতদিনে বুঝি ভাগ্য ফিরল। চুক্তি অনুযায়ী এক কোটি ২০ লাখ টাকাই পরিশোধ করলেন ছয় ভুক্তভোগীর স্বজনরা।

কিন্তু যেখান থেকে বাড়িতে ফোন করেছিলেন ভুক্তভোগীরা, সেটা টরেন্টো ছিল না। ছিল নেপালের গহীণ একটি জঙ্গল। প্রতারকচক্রের বন্দিশালা। সেখান থেকেই তাদের দেওয়া মোবাইল ফোনে শিখিয়ে দেওয়া মতো জীবন বাঁচাতে স্বজনদের কাছে ফোন দেন তারা।

গত ৬ মে এমন একটি সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তচক্রের দুই সদস্য মো. মজিবুর রহমান (৫০) ও ফয়সাল আর রশিদ ওরফে রিয়াদকে (৩০) গ্রেফতার করে র‌্যাব-২-এর সদস্যরা। গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকেই র‌্যাব কর্মকর্তারা জানতে পারেন এমন মর্মস্পর্শী কাহিনি। উন্নত দেশে পাঠানোর নামে তৃতীয় কোনও দেশের বন্দিশালায় নিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য নির্যাতন চালানো হয় জিম্মিদের ওপর।

র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম মাসুদ রানা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গোয়েন্দা সূত্রে তথ্য পেয়ে ৬ মে রাত ১টার সময় খুলনা মহানগরীর ৭/১ পূর্ব বানিয়া খামার এলাকায় অভিযান চালান তারা। সেখান থেকে দুর্বৃত্তচক্রের মূল পরিকল্পনাকারী মো. মজিবুর রহমান (৫০) ও তার সহযোগী ফয়সাল আর রশিদ রিয়া (৩০) নামের দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। মজিবরের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের দৌলারবার। তার বাবার মৃত আব্বাস আলী। ফয়সালের খুলনার বাড়ি থেকেই তাদের দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাবার নাম মো. মোফাজ্জল হোসাইন।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, রাজধানীর লালমাটিয়ার সি ব্লকে প্লানেট ওভারসিজ কনসালটেন্ট নামের একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে কিছু সংখ্যক প্রতারক চক্র সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা সাধারণ মানুষকে কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করে। পরে আস্থা অর্জনের জন্য বলে, দেশে কোনও প্রকার টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। গন্তব্যে পৌঁছে চাকরি পেয়ে টেলিফোনে আত্মীয়-স্বজনকে চাকরির বিষয়টি নিশ্চিত করার পরই তারা টাকা গ্রহণ করবে বলে জানায়। এমন লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষ। গ্রেফতারকৃতরা র‌্যাবকে জানায়, নেপাল, ভুটান, ভারত, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে প্রতিষ্ঠানটির এজেন্ট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

কয়েকজন অভিযোগকারী র‌্যাবকে জানান, গ্রেফতারকৃত মজিবুর রহমানের সঙ্গে তাদের কয়েকমাস আগে পরিচয় হয়। প্লানেট ওভারসিজ কনসালটেন্ট নামের ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চাকরি জন্য লোক পাঠিয়েছেন মর্মে কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে মজিবুর রহমান তাদের বিশ্বাস স্থাপন করেন। পরে মজিবুর ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয়ের কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তাদের ছয়জনকে ভারত হয়ে কানাডার টরেনটো নগরীর সিসকো কোম্পানিতে চাকরির জন্য পাঠানোর কথা বলে মাথাপিছু বিশ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়।

চুক্তিতে বলা হয়, কানাডায় পৌঁছে চাকরি পাওয়ার পর কোম্পানিকে টাকা পরিশোধ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী পাসপোর্টসহ বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র কোম্পানিটি জমা নেয়। কানাডায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে গত ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তিতে দুজন এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় কিস্তিতে চারজনকে ভারতে পাঠানো হয়। কয়েকদিন পর +১৬৪৭৫৫৭৯৫৮… নম্বরের একটি ফোনের মাধ্যমে তারা স্বজনদের জানান, কানাডার টরেনটো নগরীতে তারা পৌঁছে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এ সংবাদ পেয়ে স্বজনরা গ্রেফতারকৃতদের কাছে নগদ ও ব্যাংকের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা পরিশোধ করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্টুডেন্ট ভিসা, স্কলারশিপ সহায়তা, স্টাডি লোন, ভার্সিটি সিলেকশন, প্রি-ডিপারচার ও পোস্ট-অ্যারাইভাল সার্ভিস, পার্টটাইম জব সহায়তা ও ওয়ার্ক পারমিট বিষয়ে পরামর্শসহ (কনসাল্টেন্সি) অনেক সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই মূলত তাদের পেশা। কনসাল্টেন্সি নয়। আর এসবের নেপথ্যে রয়েছে নানাভাবে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়সহ নানা লোমহর্ষক কাহিনি।

বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, ভুটান, ভারতসহও বিভিন্ন দেশে তাদের এজেন্ট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি-কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ওদের পেশা। সংঘবদ্ধ এসব চক্র উন্নত দেশগুলোয় লোক পাঠানোর নামে তৃতীয় কোনও দেশে নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদ রানা জানান, গত ২০ মার্চ এক অভিযোগকারীর ছেলেসহ অন্যরা বেনাপোল বর্ডার হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসেন। তারা র‌্যাবকে জানান, দুর্বৃত্তরা তাদের ভারতের শিলিগুড়ি নিয়ে কাকরভিটা বর্ডার দিয়ে নেপালে নিয়ে যায়। সেখানে জনৈক হ্যারি ও যুবরাজ নামে দুজন বিদেশি নাগরিক তাদের একটি বাড়িতে আটক করে রাখে। অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও মৃত্যুর ভয়ভীতি দেখিয়ে বিদেশি মোবাইলে ফোনের মাধ্যমে কল করে চাকরি পেয়েছি বলে বাড়িতে জানাতে বলে। মৃত্যুর ভয়ে তারা বাড়িতে চাকরি পেয়েছেন বলে জানান।

জিম্মিকারীরা তাদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনকে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দিতে বলত। কারও আত্মীয়-স্বজন টাকা দিতে না পারলে তাদের অমানবিক নির্যাতন করা হতো। দিনের পর দিন কোনও খাবার ও পানীয় দেওয়া হতো না। হাত-পা বেঁধে পশুর মতো ছোট-ছোট কক্ষের মেঝেতে ফেলে রাখা হতো। প্রতিবার টেলিফোনে কথা বলার আগে লোহার রড দিয়ে পেটানো হতো। যেন কোনওভাবেই তাদের কথার বাইরে কেউ কিছু না বলে। এমনকি দিনে একবারের বেশি টয়লেটও ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না। টাকা দিতে বিলম্ব হওয়ায় কয়েকজনকে মেরে ফেলারও চেষ্টা করা হয়েছিল।

দেশে ফিরে ভুক্তভোগীরা আসামিদের সঙ্গে যোগযোগের চেষ্টা করলে তারা কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।আর কোনও প্রকার আইনের আশ্রয় নিলে প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়। এ ব্যাপারে সংক্রান্ত ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এ দুজনকে গ্রেফতারের পর দুর্বৃত্তচক্র পালিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়ে গেছে বলেও জানান র‌্যাব কর্মকর্তারা।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ফকিরাপুল এ/পি ৫৬/২ হোটেল শেলটারে অভিযান চালিয়ে মানব পাচারের অভিযোগে র‌্যাব-৩-এর সদস্যরা তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে, আব্দুল কুদ্দুস মৃধা, মো. দেলছের আলী মৃধা, মো. বিপ্লব ও মো. জাফর। এ সময় তাদের কাছ থেকে জাল পাসপোর্ট, পাসপোর্ট জালিয়াতির জন্য ছবি, স্কেনার, প্রিন্টার, সিপিউইসহ মানবপাচারের জন্য রক্ষিত বিভিন্ন কাগজপত্র জব্দ করেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ফকিরাপুলের আলাউদ্দিন ভবনের ষষ্ঠ তলা থেকে প্রতারণার শিকার মো. শাওন, মামুন হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, মো. আমজাদ, মো. রেজাউল ইসলাম, মো. মোতাহার, সাইদুল ইসলাম ও মেহেদী হাসানকে উদ্ধার করে।

Shortlink:

Q&A

You must be logged in to post a comment Login